ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি, তেহরানেও পাল্টা আঘাত

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ‘খুবই ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। পরদিন মঙ্গলবার ইসরায়েলের ওপর দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
ইসরায়েলের তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্প একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী হলেও তারা মনে করেন, নতুন কোনো আলোচনায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরান জানায়, এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাস সামাজিক মাধ্যমে একটি শিশুর খেলনা স্টিয়ারিং হুইলের ছবি প্রকাশ করে, যা ট্রাম্পের সেই বক্তব্যকে ব্যঙ্গ করে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, যিনি যুদ্ধ শুরুর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ইরানে রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব বৃদ্ধি: ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর প্রভাব বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কাছে জবাবদিহি করা এই বাহিনীর সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের জোলকদরকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি গত সপ্তাহে ইসরায়েলি হামলায় নিহত আলি লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানির মতো প্রভাবশালী ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে জোলকদরের ভূমিকা নাও হতে পারে।
সংঘাতের বিস্তার ও জ্বালানি সংকট: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালায়। তাদের দাবি ছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যদিও মধ্যস্থতাকারী ওমান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছিল।
এরপর থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং বিশ্ব তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে, লেবানন থেকে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর হামলার জবাবে ইসরায়েল পৃথক সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, তারা দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত দখল করার পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, যেখানে ‘সন্ত্রাস’ রয়েছে, সেখানে কোনো বসতি বা বাসিন্দা থাকতে পারবে না—যা হিজবুল্লাহকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের বৃহত্তম শহর তেল আবিবে সাইরেন বেজে ওঠে। একটি বহুতল ভবনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভবনটিতে সরাসরি আঘাত নাকি প্রতিরোধ ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ পড়েছে—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের ফায়ার সার্ভিস জানায়, একটি ভবনে আটকে পড়া সাধারণ নাগরিকদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা সোমবার তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড সেন্টারগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। রাতভর আরও ৫০টির বেশি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও রয়েছে।
ইরানের রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয় বলে জানিয়েছে দেশটির বার্তা সংস্থা।
এদিকে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজে একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় অন্তত আটজন নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৭টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
আলোচনা অস্বীকার, বাজারে অস্থিরতা: ট্রাম্প সোমবার ঘোষণা দেন, ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে পাঁচ দিনের মধ্যে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তিনি আপাতত সে পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।
এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে শেয়ারদর বেড়ে যায় এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। কিন্তু মঙ্গলবার আবারও পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এ সংক্রান্ত দাবি ‘ভুয়া খবর’।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১.৯৩ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এদিকে, ইউরোপীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরাসরি আলোচনা না হলেও মিসর, পাকিস্তান ও উপসাগরীয় দেশগুলো দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার অংশ নিতে পারেন।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







