• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

রাঙ্গাবালীর ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ বন্ধ দেড় বছর

রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি    ১১ মার্চ ২০২৬, ০১:১৩ পি.এম.
অর্ধনির্মিত হাসপাতাল ভবন দেড় বছর ধরে থেমে আছে-ছবি-ভিওডি বাংলা

রাঙ্গাবালী পটুয়াখালী রোগী মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য নদীপাড়ি দিতে হয়, তারপরে ঘন্টার পর ঘন্টা পথ পাড়ি দিতে হয়। এই বাস্তবতা রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের প্রতিদিনের জীবন। দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও আগুনমুখা নদীবেষ্টিত এই দ্বীপ উপজেলা তিনদিকে নদী এবং একদিকে সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এক মৌলিক অধিকার, যা আজও তারা পাচ্ছেন না।

উপজেলায় নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল বা একজন সরকারি এমবিবিএস ডাক্তার। ফলে জরুরি চিকিৎসা পেতে স্থানীয়রা নদীপাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী গলাচিপা বা কলাপাড়া উপজেলা হাসপাতালে যেতে বাধ্য। জটিল রোগের ক্ষেত্রে আরও দূরে, জেলা সদর পটুয়াখালী বা বরিশাল শহরে যেতে হয়। কিন্তু নৌ-যোগাযোগ সীমিত এবং সন্ধ্যার পর প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক সময় রোগীদের ঘর থেকে বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে, রোগীরা প্রায়শই গ্রাম্য ডাক্তার, হেকিম-কবিরাজ বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেন। তবে এসব সেবায় জ্বর, সর্দি-কাশির মতো সাধারণ চিকিৎসা ছাড়া উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নেই। গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও মুমূর্ষু রোগীদের জন্য এখানকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেছে ২০১২ সালে, কিন্তু দীর্ঘ এক যুগ পেরিয়েও এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে বাজেট সংকটের কারণে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অর্ধনির্মিত ভবনটি যেন স্বাস্থ্যবঞ্চনার নীরব প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরজমিন দেখা গেছে, চারতলা হাসপাতাল ভবনের তিনটি ছাদ এবং নিচতলার আংশিক কিছু দেওয়ালের কাজ শেষ হয়েছে। দুটি কোয়ার্টার ভবন ও একটি সাব-স্টেশন, চলাচলের পথ এবং বাউন্ডারি ওয়ালসহ কিছু কাজ আংশিক আছে, বাকিটা বন্ধ। লোহার রডে মরিচা ধরে ক্ষয় শুরু হয়েছে। প্রতিটি তলার ভিম-কলামের ঢালাই যথাযথভাবে হয়নি, ফলে ফাঁকা স্থানে প্লাস্টার করা হয়েছে। নিচ তলার ফ্লোর পর্যন্ত বালি ভরাট হয়নি।

পটুয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুটি ধাপে কাজের মোট বাজেট ২০ কোটি ৮৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা। প্রথম ধাপের কাজ (১২ কোটি ৬৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা) যৌথভাবে আবুল কালাম আজাদ ও প্রাইম কনস্ট্রাকশন কোম্পানি পায়। দ্বিতীয় ধাপের কাজ (৮ কোটি ১৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা) পায় আবুল কালাম আজাদ, প্রাইম কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স আয়ান এন্টারপ্রাইজ। ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল কার্যাদেশ পাওয়া প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের কাজের মেয়াদ ছিল এক বছর। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়েছে ৫৩ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপের ৫৭ শতাংশ। তবে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয়রা দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে স্বাস্থ্যসেবা চালুর দাবি জানাচ্ছেন। রাঙ্গাবালী হাইয়ে মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহেলা পারভীন বলেন, “এ এলাকার মানুষ চিকিৎসা পেতে গলাচিপা বা পটুয়াখালীতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও গুরুতর রোগীরা অনেক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত হাসপাতাল নির্মাণ সম্পন্ন হোক, যাতে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা সহজে পেতে পারেন।”

বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হোসেন আহমেদ বলেন, “এ এলাকায় আধুনিক চিকিৎসা এখনও নেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকে সাধারণ চিকিৎসার বাইরে কোনো উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। অনেক গর্ভবতী মা সিজারের জন্য যাওয়ার পথে মারা যান। সাপে কামড়ানো রোগীদের জন্য এন্টিভেনম না থাকায় রোগী বাঁচানো কঠিন হয়। তাই দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শেষ করা জরুরি।”

রাঙ্গাবালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আঃ রহমান ফরাজি জানান, “মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করার আশ্বাস এমপি মহাদয় দিয়েছেন।”

পটুয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “গত সপ্তাহে রাঙ্গাবালী গিয়েছি। এখানে হাসপাতাল অত্যন্ত জরুরি। বিগত সরকারের সময় কাজ বন্ধ ছিল। এখন একনেকে অনুমোদন হয়েছে। আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আছি। আশা করছি, ২০২৭ সালের মধ্যে হাসপাতালটি চালু হবে।”

পটুয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, “প্রকল্পটি নতুনভাবে একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান। খুব শিগগিরই নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হবে।”

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদ ভূঞা জানান, “টিপিবি পাস হয়েছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। টেন্ডার সম্পন্ন হলে পুনরায় কাজ শুরু হবে।”

রাঙ্গাবালীর দ্বীপবাসী আশা করছেন, নতুন সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় অর্ধনির্মিত হাসপাতালটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে এবং তারা পাবে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা।

ভিওডি বাংলা-মো. কাওছার আহম্মেদ/জা  

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
গৌরীপুরে এক্যফোরামের সভাপতির ওপর হামলা
গৌরীপুরে এক্যফোরামের সভাপতির ওপর হামলা
কুমারখালীতে জামাতের ইফতারে বিশিষ্টজনেরা
কুমারখালীতে জামাতের ইফতারে বিশিষ্টজনেরা
কুমারখালীতে অবৈধ ইটভাটা গুড়িয়ে দিলো প্রশাসন
কুমারখালীতে অবৈধ ইটভাটা গুড়িয়ে দিলো প্রশাসন