• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

যুদ্ধ থেকে পেছানোর পথ খুঁজছেন ট্রাম্প

ভিওডি বাংলা ডেস্ক    ১০ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৩ পি.এম.
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে আক্রমণ চালানোর সেই তীব্র গতি থেকে কিছুটা পিছপা হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত কয়েকদিনের যুদ্ধ কৌশল ও পরিণতিসহ নানা দিক বিশ্লেষণ করে এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আমেরিকার উস্কানিতে যুদ্ধ বাধিয়ে অনেকটা অনিরাপদ রয়েছেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু। মৃত্যুর গুজব উড়িয়ে প্রকাশ্যে বেরিয়ে এলেও অনেকটা পলাতক জীবনই যাপন করছেন তিনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এমন তথ্য উঠে এসেছে। 

যদিও পেন্টাগন মঙ্গলবার ইরাকে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পেন্টাগন এ কথা বললেও কার্যত আমেরিকার কর্মকান্ড ও যোগাযোগ এবং বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বানগুলো যুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের পেছানোর ইঙ্গিতই দিচ্ছে। 

ঢাকার বিভিন্ন দূতাবাসের সূত্রগুলোও আভাস দিচ্ছে যে, মার্কিন প্রশাসন ট্রাম্পকে বোঝাচ্ছে। আর পরিণতি আচ করতে পারছেন ট্রাম্পও। তিনি সম্ভবত যুদ্ধ থেকে পেছানোর পথ খুঁজছেন। 

তবে ইরানকে থামানো যাচ্ছে না। সবশেষ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গেও ফোনালাপ চালান। ভারতকেও পাশে রাখছেন এই যুদ্ধে।

ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে সটকে পড়তে বললেন উপদেষ্টারা

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ থেকে দ্রুত সরে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে পরামর্শ দিচ্ছেন তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একটি অংশ। মূলত বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েই উপদেষ্টারা এমন প্রস্তাব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। 

ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প নিজেও যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত দিয়ে দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যেই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করেছে এবং অভিযানটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশ এগিয়ে আছে। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে নাম প্রত্যাহার করা বেশ জটিল হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন অবস্থানগুলোতে ইরানের ক্রমাগত পাল্টা হামলা এবং এই অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি ওয়াশিংটনের সরে আসার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ার করে রেখেছেন যাতে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথগুলোতে কোনো বাধা সৃষ্টি না করা হয়। পর্দার আড়ালে উপদেষ্টারা যুদ্ধ শেষের একটি সুস্পষ্ট কৌশল ঘোষণার জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন কারণ তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় আসন্ন নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রিপাবলিকান মিত্ররা। 

জনমত জরিপেও দেখা গেছে যে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট প্রশাসনের মধ্যে বিভক্তির কথা অস্বীকার করেছেন এবং এই প্রতিবেদনটিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে থাকায় এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে।

যুদ্ধবিরতি চায় না ইরান

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, "আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না।  কারণ আমরা মনে করি আগ্রাসনকারীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে যাতে সে শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের প্রিয় ইরানে হামলার কথা না ভাবতে পারে।"

তিনি আরও বলেন, "জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য যুদ্ধ, আলোচনা, যুদ্ধবিরতি এবং আবার যুদ্ধ - এই চক্র চালু রাখতে চায়। আমরা এই চক্র ভেঙে দেবো।"

খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরও এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য "অনুতপ্ত" না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।

পিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফের কোনো আলোচনায় বসবে বলে তার মনে হচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার অভিজ্ঞতা ইরানের জন্য খুবই তিক্ত।

তিনি আরও বলেন যে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দুই দফায় আলোচনা হয়েছিলো। তারপরই ইরানের ওপর এবারের এই হামলা চালানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আগে দুই দফা আলোচনার পরই ইরানের ওপর হামলা হয়েছে।

এদিকে, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য জন্য শর্ত হলো - ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কখনও আক্রমণ করা হবে না, এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।

মার্কিন টমাহক ভান্ডার, সংকটে পেন্টাগন

ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত 'অপারেশন এপিক ফিউরিতে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইলের তীব্র সংকটে পড়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জ্যাক বাকবি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই উচ্চ-তীব্রতার বিমান অভিযানে ইরানের সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কমান্ড সেন্টারগুলো ধ্বংস করতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে।  এর ফলে মার্কিন সামরিক ভাণ্ডারে থাকা টমাহকের মজুদ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এটাই এখন ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার এবং সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো গত কয়েক দশকের মধ্যে পেন্টাগনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দূরপাল্লার অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রায় এক হাজার মাইল পাল্লার এই নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রটি ব্যবহারের প্রধান কারণ হলো এর মাধ্যমে পাইলট বা দামি যুদ্ধবিমানকে বিপদে না ফেলেই ইরানের গভীর অভ্যন্তরে থাকা শত্রুঘাঁটিতে আঘাত হানা সম্ভব। বিশেষ করে যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের রাডার ফাঁকি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে এই ক্রুজ মিসাইলই ছিল মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রধান ভরসা।

তবে এই বিপুল পরিমাণ ব্যবহারের বিপরীতে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় একটি বড় ধরনের শিল্প ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রায় ৪ হাজার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ছিল যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফুরিয়ে আসছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পেন্টাগন বছরে গড়ে মাত্র ৯০টি করে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে আসছিল। এই মন্থর উৎপাদন হার চলমান যুদ্ধের বিপুল চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

প্রতিটি টমাহক ব্ল্যাক-ফাইভ ভেরিয়েন্টের ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১৩ লক্ষ মার্কিন ডলার যা পেন্টাগনের বাজেটের ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে। মার্কিন নৌবাহিনী আশির দশক থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার টমাহক ক্রয় করলেও তার একটি বড় অংশ মহড়া এবং বিগত বিভিন্ন যুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। ইরানের ভূখণ্ড অত্যন্ত বিশাল এবং ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় হওয়ায় সেখানে পদাতিক বাহিনীর চেয়ে এ ধরণের স্ট্যান্ড-অফ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি যা মজুদ খালি হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ওহাইও-ক্লাসের মতো বিশাল সাবমেরিনগুলো একেকবারে ১৫৪টি টমাহক বহন করতে পারে যা মার্কিন নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু যদি ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ঠিক না থাকে তবে এই শক্তিশালী নৌযানগুলো সমুদ্রে অনেকটা অকেজো হয়ে পড়বে। বিশ্লেষক বাকবি সতর্ক করেছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার এই সংকট ২০ দশকের শেষভাগ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক সক্ষমতায় একটি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করতে পারে। এটি কেবল ইরানের সাথেই নয় বরং ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরাশক্তির সাথে দ্বন্দ্বে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো কীভাবে দ্রুততম সময়ে এই ‘ম্যাগাজিন ডেপথ’ বা অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধি করা যায়। কারণ আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল বীরত্বের ওপর নির্ভর করে না বরং এটি শিল্প সক্ষমতা এবং রসদ সরবরাহের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যদি দুই বছরের উৎপাদন চক্র ত্বরান্বিত করা না যায় তবে ইরান অভিযানের পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প এবং সম্ভবত আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে হতে পারে।

ভিওডি বাংলা/আরআর

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ইরানে হামলায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা আমিরাতের
ইরানে হামলায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা আমিরাতের
হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে আমিরাতের দুই সৈন্য নিহত
হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে আমিরাতের দুই সৈন্য নিহত
‘রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে, আপনি বসে’, মোদির সমালোচনা করে মমতা
‘রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে, আপনি বসে’, মোদির সমালোচনা করে মমতা