ইরানে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহত ১ হাজার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে ইরানে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার জেরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পঞ্চম দিনে ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। টানা বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বুধবার (৪ মার্চ) রাজধানী তেহরানসহ পবিত্র শহর কোম, ইসফাহান এবং পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নিরাপত্তা স্থাপনায় ইসরায়েলি বাহিনী ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস আইআরজিসি-এর সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। বিশেষ করে আধাসামরিক শাখা ‘বাসিজ’-এর ভবন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কমান্ডের কার্যালয়কে টার্গেট করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বহু আবাসিক ভবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বেশ কিছু এলাকা। শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে তেহরান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহতের সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩০০ শিশু ও কিশোর রয়েছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় রাজধানী তেহরান থেকে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ মানুষ অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। নিরাপত্তাহীনতা ও সম্ভাব্য আরও হামলার আশঙ্কায় শহর ছাড়ছেন সাধারণ মানুষ।
ইসরায়েলি হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ জোরদার করেছে ইরান। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে ১৯তম দফার হামলা শুরু হয়েছে। এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রু প্রমিজ-৪’।
আইআরজিসি দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ‘আমেরিকান সন্ত্রাসী ঘাঁটি’ এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। যদিও এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতির নির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইসফাহানের পারমাণবিক কেন্দ্র ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি দুটি ভবনে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে মূল স্থাপনা বা তেজস্ক্রিয় পদার্থের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে।
আইএইএ আরও বলেছে, বর্তমানে বিকিরণের কোনো ঝুঁকি নেই। তবুও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সংঘাতের মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত শনিবারের বিমান হামলায় নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজার প্রস্তুতি চলছে তেহরানে। একই সঙ্গে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন প্রক্রিয়াও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।
ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আহমদ খাতামি জানিয়েছেন, উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পশ্চিমা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ধারণা, খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের দৌড়ে এগিয়ে আছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, তেহরানের নেতৃত্ব বর্তমানে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “ইরানের পরবর্তী নেতা যেই হোন না কেন, তিনি যদি ইসরায়েল ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন, তবে তাকেও নির্মূল করা হবে।”
সংঘাত কেবল সামরিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই; কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও উত্তাপ বাড়ছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল শেকারচি সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননে ইরানি দূতাবাসে হামলা হলে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইসরায়েলি দূতাবাসগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, “ট্রাম্প কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং আলোচনার টেবিলকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।”
ক্রমবর্ধমান হামলা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ-সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে।
সূত্র : আল-জাজিরা।
ভিওডি বাংলা/জা







