অনৈতিক প্রস্তাবে ক্ষিপ্ত, রুমমেটের হাতে হত্যা

রাজধানীতে মানবদেহ খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার রহস্য পুলিশ উদ্ঘাটন করেছে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বাসিন্দা ওবায়দুল্লাহকে তার নিজ রুমমেট শাহীন আলম হত্যা করে দেহ সাত অংশে বিভক্ত করে শহরের বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, হত্যার পেছনে মূল কারণ ছিল রুমমেটের সঙ্গে ঝগড়া এবং অনৈতিক প্রস্তাব।
রোববার (১ মার্চ) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন-অর-রশীদ মিন্টো রোডের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া দেহের খণ্ডগুলো একই ব্যক্তির। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত শাহীন আলমকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, নিহত ওবায়দুল্লাহর দেহের একটি অংশ এখনও উদ্ধার করা যায়নি। সেটি আমিনবাজারের ব্রিজ থেকে ফেলা হয়েছে, এবং তা উদ্ধারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ওবায়দুল্লাহ একটি হোমিওপ্যাথি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতেন। অপরদিকে শাহীন আলম হোটেল হিরাঝিলে কর্মরত ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে শাহীন স্বীকার করেন, ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার দিকে তিনি ওবায়দুল্লাহকে হত্যা করেন। রাত ৯টার পরে দেহের খণ্ডগুলো শহরের বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার বিবরণে বলা হয়েছে, হত্যার রাত ওবায়দুল্লাহ শাহীনকে সিগারেট আনতে বলেন। কিন্তু শাহীনের কাছে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় তিনি আনতে পারেননি। এরপরও বাসায় ফিরে আসার পর তাকে আবার সিগারেট, নানরুটি এবং কাবাব আনার জন্য পাঠানো হয়। কাবাব এবং নানরুটি আনার পরও দেখা যায়, ওবায়দুল্লাহ একাই তা খাচ্ছিলেন।
পরবর্তীতে ঘুমানোর সময় ওবায়দুল্লাহ জোরে জোরে কথা বলায় শাহীন বিরক্ত হয়ে ওঠেন। ফোনে ধীরে কথা বলার জন্য অনুরোধ করলেও ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে ওবায়দুল্লাহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করেন। এরপর গোসলখানায় কাপড় ধোয়ার সময় শাহীন তার ঘাড় ও গলায় চাপাতি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন। নিহতের দেহটি শহরের বিভিন্ন স্থানে খণ্ড করে ফেলা হয়।
ডিসি হারুন-অর-রশীদ আরও বলেন, নয়াপল্টনের আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীতে দুটি হাত, বায়তুল মোকাররমের গেটের পাশে একটি পা, কমলাপুর রেলস্টেশনের সংলগ্ন এলাকায় মাথা ফেলা হয়েছে। মতিঝিল ও কমলাপুরের ময়লা বোঝাই কনটেইনারে ড্রামভর্তি দেহাংশ রাখা হয়েছে। বাকি অংশগুলো আমিনবাজার সালিপুর ব্রিজ থেকে ফেলা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান চলমান রয়েছে।
শাহীন হত্যার ঘটনা নিশ্চিত হয় সিসিটিভি ফুটেজ এবং তার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে। পুলিশের হাতে এসেছে চাপাতি, যা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, ওবায়দুল্লাহ মাঝে মাঝে শাহীনকে অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন, যা তিনি নিতে পারতেন না। অনেক রাতেই ওবায়দুল্লাহ শাহীনের রুমে প্রবেশ করতেন; তখন শাহীন তাকে বের করে দিয়ে দরজা লক করতেন।
ঘটনার পরও শাহীন স্বাভাবিকভাবে হোটেলে কাজ করতেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ দেখাননি। তাকে হিরাঝিল হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ২টার দিকে কাকরাইল স্কাউট ভবনের সামনে কালো পলিথিনে মোড়ানো মানুষের পা উদ্ধার করা হয়। এর পর শনিবার সকাল ১০টার দিকে জাতীয় স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তায় আরও দুটি হাত পাওয়া যায়। দুপুরে কমলাপুর রেল স্টেশন এলাকায় আরেকটি পা উদ্ধার করা হয়।
নিহত ওবায়দুল্লাহ শিবপুরের তাতার গ্রামের আব্দুল হামিদ মিয়ারের ছেলে। তার মায়ের নাম রানী বেগম। তিনি মতিঝিলের কবি জসীম উদ্দীন রোডের একটি ফ্ল্যাটে শাহীন আলমের সঙ্গে থাকতেন। হত্যাকাণ্ড এবং খণ্ডিত দেহ ফেলার ঘটনায় পুরো রাজধানী তর্কিত হয়েছে, এবং পুলিশ জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
ডিএমপি আশা করছে, উদ্ধার অভিযান শেষে দেহের বাকি অংশও পাওয়া যাবে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে হত্যার সঠিক কারণ উদ্ঘাটিত হবে।
ভিওডি বাংলা/জা







