শেখ রবিউল আলমকে ‘ভিলেন’ প্রমাণ করতে প্রপাগান্ডা!

শেখ রবিউল আলম সাহসী, মেধাবী ও যুক্তিবাদী একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। হঠাৎ সামাজিক মাধ্যমে কিছু ঘটনার খণ্ডিত অংশের মনগড়া বিশ্লেষণ ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। ওঁত পেতে থাকা ‘বট প্রপাগান্ডা’ মনের মাধুরী মিশিয়ে একজন পরিচ্ছন্ন নেতাকে কাল্পনিক ভিলেন হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন শেখ রবিউল আলম।
আমি মজা করে বলি—একই সঙ্গে তিনি একজন ওবায়দুল কাদের, একজন মজিবুল হক এবং একজন শাহজাহান খানের সম্মিলিত তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রত্যাশা যেমন বড়, চ্যালেঞ্জও তেমনই। টকশোতে অখণ্ডনীয় যুক্তিতে পারদর্শী শেখ রবি অনেক প্রবীণ রাজনীতিককে ছাড়িয়ে সবার নজরে এসেছেন। তার অতীত ও ক্যারিয়ার সম্পর্কে অনেকেরই অজানা।
তাই বিরোধী শিবির থেকে বিরোধিতার নামে বিরোধিতা এবং নিরপেক্ষতার নামে অনেকের না বুঝে তাল মেলানো দুঃখজনক।
শেখ রবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উচ্চতর ডিগ্রিধারী। ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তথাকথিত ক্যাডার বা সন্ত্রাসী রাজনীতির সঙ্গে তার কখনো সম্পৃক্ততা ছিল না। যদিও ক্যাডার রাজনীতির সুবাদে অনেক জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাকেও সত্য-মিথ্যা নানা খুন-খারাবির মামলায় অভিযুক্ত হতে দেখা যায়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ সময় রাজপথে ও গণমাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাকে অসংখ্যবার আটক ও জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। তার আপসহীন ভূমিকার কারণে বিএনপির হাইকমান্ড তাকে গুরুত্বপূর্ণ আসনে মনোনয়ন দেয় এবং বিজয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাকে আস্থায় নিয়ে মন্ত্রিসভায় স্থান দেন।
প্রথম ধাপে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দুই-তিন দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডার শিকার হন। বিভিন্ন ফটোকার্ডে তাকে ‘খুনি’, ‘সাজাপ্রাপ্ত আসামি’, ‘পলাতক’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ফলে তার নিরঙ্কুশ সাফল্যের জায়গায় প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিজয়ী হতে হয়।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সূত্রে তার কোম্পানির একটি প্রকল্প এলাকায় সংঘটিত ‘মারপিট ও হত্যাকাণ্ডের’ দুঃখজনক ঘটনায় প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে তাকেও অভিযুক্ত করা হয়। বলাবাহুল্য, তিনি রাজপথে ও টকশোতে সক্রিয় থাকলেও তাকে ‘পলাতক’ ও ‘খুনি’ হিসেবে প্রপাগান্ডা চালানো তার ভাবমূর্তি ও ভোটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সম্প্রতি আলোচিত এক সভায় তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘কোনো ধরনের চাঁদাবাজি প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।’ প্রসঙ্গক্রমে শ্রমিক ও মালিক সংগঠনগুলোর উত্তোলিত টাকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলেন। তিনি বলেন, যেহেতু এসব টাকা সংশ্লিষ্টরা নিজেদের কল্যাণের জন্য পারস্পরিক সমঝোতায় নেয়, সেগুলোকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, শ্রমিক বা মালিক সমিতির নামে উত্তোলিত টাকা চাঁদাবাজির অংশ কি না। যেহেতু এটিকেও জবাবদিহিতার আওতায় এনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, তাহলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ না থাকলে তা চাঁদা হিসেবে গণ্য হবে না। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনদের মতে, এ ব্যাখ্যার ফাঁকফোকরে চতুর চাঁদাবাজরা পার পেয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, দেশের সব রাজনৈতিক দলের বৈধ আয়ের উৎস হলো নেতা-কর্মীদের প্রদত্ত চাঁদা। বিশ্বব্যাপী এর বৈধতা যেমন আছে, তেমনি যথাযথভাবে তা সংগ্রহ ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশের বিধানও রয়েছে। আমাদের গুরুতর জাতীয় সংকট ‘চাঁদাবাজি’ হলো অবৈধ দখল ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। সড়ক-মহাসড়কে অলিখিত ও অবৈধ টোকেননির্ভর চাঁদাবাজি মাফিয়া শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটিকে চ্যালেঞ্জ করা অতীতে কোনো মন্ত্রীর পক্ষেই সহজ হয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সড়কে বেপরোয়া চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে বট প্রপাগান্ডার শিকার হওয়া বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক মাধ্যমের অনৈতিক ব্যবহারের বহিঃপ্রকাশ।
আমাদের গতানুগতিক রাজনীতিতে অনেক সময় সন্ত্রাসী ও অপরাধীদেরও পুনর্বাসন করতে দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃত অপরাধী ও খুনিদের মতো একজন মার্জিত, শিক্ষিত ও প্রতিবাদী কণ্ঠকে ‘প্রপাগান্ডা’ দিয়ে ‘ভিলেন’ প্রমাণের চেষ্টা দেশপ্রেমিক ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিকদের হতাশ করবে। রবিউল আলম সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, কোনো ধরনের চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যেসব কর্মী-সমর্থক মন্ত্রীর বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ নিয়ে তোলপাড় শুরু করেছেন, তাদের প্রতি আহ্বান—সব ধরনের চাঁদা বন্ধ করতে চাইলে দলের নামে তহবিল, ইয়ানত বা হাদিয়া সংগ্রহ এবং রাজস্ব বা বায়তুল মালের কার্যক্রমও বন্ধ করতে হবে। তাহলেই এ ধরনের একপেশে বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ হবে। একটি অচলায়তন ভাঙতে পর্যায়ক্রমে ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়াই সুবিবেচনাপ্রসূত। উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রপাগান্ডা বিভ্রান্তির জন্ম দেয়; সংশ্লিষ্টরা এর দায় এড়াতে পারবেন না।
বোরহানউদ্দীন ইউসুফ: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ভিওডি বাংলা/আ
নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। ভিওডি বাংলা সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, ভিওডি বাংলা কর্তৃপক্ষের নয়।



