ট্রেন্ডার বাতিলের দাবি
পিডি ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

নতুন সরকার আসার আগেই তড়িগড়ি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) একটি বড় প্রকল্পে স্বল্প সময়ে শতাধিক টেন্ডার আহ্বান এবং সময়সীমা না বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন যে, এতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়েছে।
এদিকে, নতুন সরকারের কৃষিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর কাছে টেন্ডার বাতিল করে নতুন টেন্ডার আহ্বান করার দাবি করেছেন ঠিকাদাররা।
সূত্র জানায়, বিএডিসির অধীন বাস্তবায়নাধীন “বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প” এর আওতায় গত ২৬ জানুয়ারি ই-জিপি পোর্টালে ১২৬টি দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং এর আগে ডিসেম্বর মাসে প্রায় ১০০টি টেন্ডার আহ্বান ও খোলা হয়েছিল। প্রকল্প পরিচালক ড. ইব্রাহিম খলিল অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন বিপুলসংখ্যক দরপত্র প্রকাশকে সংশ্লিষ্টরা অস্বাভাবিক, উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও তাড়াহুড়ো হিসেবে দেখছেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, তড়িঘড়ি করে ইজিপিতে গত ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি টেন্ডারগুলোর দাখিলের আহবান এবং শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ই-জিপি সিস্টেম আপগ্রেডেশনের কারণে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি এবং ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় প্রশাসনিক ও ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ফলে দরপত্র প্রস্তুতি ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রায় ১০ দিন সময় নষ্ট হয়। এ কারণে একাধিক ঠিকাদার লিখিতভাবে অন্তত তিন কার্যদিবস সময় বাড়ানোর আবেদন করে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ওই আবেদনের সময় না বাড়িয়ে তড়িগড়ি করে শেষ করে দেয়। এ কারণে বহু ঠিকাদাররা এই প্রকল্পের টেন্ডার অংশগ্রহণ করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, একযোগে বিপুলসংখ্যক টেন্ডার লাইভে থাকায় স্বল্প সময়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ ও বাস্তবভিত্তিক ছিল না। এতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেয়া এবং তার পছন্দনীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্যই নির্বাচনের আগেই তড়িঘড়ি করে টেন্ডার সম্পন্ন করছে ।
জানা গেছে, ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার চার বছরের প্রকল্পের বিবিধ বীজ প্রসেসিং সামগ্রী ক্রয় ও নির্মাণ কাজের দরপত্র মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ২০০ কোটি টাকারও অধিক টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে যাচ্ছে। অনেকটা তড়িঘড়ি করেই নির্বাচনের আগ মুহূর্তে অসৎ উদ্দেশ্যে ১২৬ টি টেন্ডার আহবান করেন পিডি ইব্রাহিম খলিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পিডি পদে থাকতে পারেন কি না, এই ভয়ে আগেভাগে দরপত্র কাজ সম্পন্ন করে অনৈতিক সুবিধা নিতেই এই টেন্ডার আহ্বান করা হয়ে বলে অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে।
মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ প্রোপাইটার মো. নেছার উদ্দিন বলেন, বিএডিসির চেয়ারম্যান এবং প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিত ভাবে দরপত্রের সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু তারা সময় বৃদ্ধি করেনি।
বিপুল সংখ্যক দরপত্র একযোগে লাইভ থাকায় স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না। এ জন্য সময় বাড়ানোর আবেদন করি। আমরা চাই, নতুন সরকার এই প্রকল্পেরর টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করবেন। পাশাপাশি এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিলের বিষয়ে তদন্তের দাবী জানাই। কারণ তিনি মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ২০০ কোটি টাকার বেশি দরপত্র সম্পূর্ণ করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার জানান, প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিলকে টাকা না দিলে কেউ কাজ পায় না। কাজের টাকার পরিমাণের উপর নির্ভর করে পার্সেন্টেজ নির্ধারণ করেন তিনি। প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিল এর বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
তদবীরবাজ এই কর্মকর্তা আওয়ামী সরকারের পুরোটা সময় ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। তিনি “মুজিব বর্ষে বিএডিসি, কৃষি সেবায় দিবানিশি” স্লোগান খুব গর্ব করে প্রচার করতেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা বাহাউদ্দিন নাসিমের সাথে সখ্যতার কারনে বিগত ফ্যাসিষ্ট শাসনামলে ভালো ভালো পদে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর তিনি আবার ভোল পাল্টে নিজেকে বঞ্চিত, আওয়ামী লীগ বিরোধী, ছাত্রজীবনে ছাত্রশিবির করতো বলে প্রচার করে বিএডিসি'র মার্কেটিং প্রজেক্টের আরেক দুর্নীতিবাজ জামাত-শিবিরের পিডি মাহমুদুল আলমের সাথে সখ্যতা সৃষ্টি করে এবং তার মাধ্যমে সবাইকে ম্যানেজও করেছেন। উল্লেখ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট তারিখে জারীকৃত আদেশে উক্ত প্রকল্পে পিডি হিসেবে ড. মো: ইব্রাহিম খলিল’কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রের দাবি, এই অনিয়মে শুধু প্রকল্প পর্যায় নয়, শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্রও জড়িত থাকতে পারে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চক্র দরপত্রে অস্বাভাবিক দর নির্ধারণ, ভুয়া নথি যাচাই এবং কমিশন বণ্টনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ৯ ফেব্রুয়ারির ২০.৮০৪.০২২.০০.০০.০০৬.২০১০/৪ স্মারকে জারিকৃত অবশ্য পালনীয় নির্দেশাবলীর ৩.২ (ঙ) অনুযায়ী “প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস চাকুরীর মেয়াদ থাকতে হবে” মর্মে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ইব্রাহীম খলিলের চাকুরির মেয়াদ প্রকল্প শেষ হওয়ার ছয় মাসের আগেই শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া ৩.২(খ) অনুযায়ী যে প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা এবং প্রকিউরমেন্ট সংক্রান্ত প্রশিক্ষনের আবশ্যকতা রয়েছে তাতেও তার ঘাটতি রয়েছে। তারপরও তাকে পিডি হিসেবে নিযুক্ত রয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় দৈনিকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয় এবং পিডি নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা যথাযথভাবে পালনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু অদৃশ্য শক্তিতে ড. ইব্রাহিম খলিলের যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্বেও তাকেই পিডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এতে জামাত-শিবিরের বিএডিসি'র মার্কেটিং প্রজেক্টের পিডি মাহমুদুল আলমের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে ড. ইব্রাহিম খলিল উক্ত বীজ প্রসেসিং প্রজেক্টের পিডি হন। জামাত-শিবির সংশ্লিষ্ট এই দুই পিডি একত্রে চলাফেরা, পরামর্শ ও টেন্ডার বাণিজ্য করে বেড়ান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান যে, উক্ত ইব্রাহিম খলিল বিভিন্ন জায়গায় বলে বেড়ান যে, তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করে এই পদে এসেছেন এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উঠাতে হবে। ফলে নতুন সরকার আসার আগেই তিনি ট্রেন্ডার আহবান করে অবৈধ উপায় প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা নিজে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠছে।
তাদের দাবী এই প্রকল্পের পিডি'সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের ব্যাংক হিসাব, স্থাবর সম্পত্তি ও সাম্প্রতিক আর্থিক লেনদেন যাচাই করলে অস্বাভাবিক আর্থিক বৃদ্ধি সহজেই উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।
একাধিক ঠিকাদার বলেন , প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়নের পূর্ণাঙ্গ অডিট, ই-জিপি ডেটা বিশ্লেষণ, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীন তদন্ত এবং তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সরকারী গোয়ান্দা সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করলে সব অনিয়মই বের হয়ে যাবে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বর্তমান মন্ত্রী সভায় কৃষি মন্ত্রী মহোদয় কুমিল্লা অঞ্চলের হওয়ায় এবং তার বাড়ীও কুমিল্লা অঞ্চলে হওয়ায় কৃষিমন্ত্রী'কে মেনেজ করতে উপায় খুঁজছেন।
এ বিষয়ে বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিলের তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার দপ্তরে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি এবং তার মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
ভিওডি বাংলা/ আ







