বছরের প্রথম মাসে ৫৫৯ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৮৭

নতুন বছরের প্রথম মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অব্যাহত রকমের ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। জানুয়ারি ২০২৬ মাসে মোট ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮৭ জন নিহত এবং ১১৯৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬৮ জন নারী এবং ৫৭ জন শিশু রয়েছে। দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২০৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৯৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ৪০.২৪ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৭.২০ শতাংশ। এছাড়া পথচারী হিসাবে ১৩২ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ২৭.১০ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী হিসেবে ৬৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ১৩.৭৫ শতাংশ।

যানবাহনভিত্তিক বিস্তারিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী হিসেবে ১৯৬ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বাসের যাত্রী ২১ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্র্যাক্টরের আরোহী ২৮ জন, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের আরোহী ৯ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী ৭৭ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৩ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্ঘটনার ভৌগলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫৬টি দুর্ঘটনা জাতীয় মহাসড়কে, ২০৭টি আঞ্চলিক সড়কে, ৮৫টি গ্রামীণ সড়কে, ১০৩টি শহরের সড়কে এবং ৮টি অন্যান্য স্থানে ঘটেছে। দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী, ১৩৫টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২০৯টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা, ১৩৭টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া, ৭২টি যানবাহনের পেছনে আঘাত এবং ৬টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
যানবাহন অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারী যানবাহন দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ২৮.৫৮ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৪.৫১ শতাংশ, থ্রি-হুইলার ১৮.৫৩ শতাংশ, বাস ১২.২০ শতাংশ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স, জিপ ৪.৬৩ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৩.৯৫ শতাংশ, বাইসাইকেল-রিকশা ২.১৪ শতাংশ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৫.৪২ শতাংশ। দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত মোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৮৮৫টি।
সময়সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে দুর্ঘটনার হার ৬.৬১ শতাংশ, সকাল ২৬.৬৫ শতাংশ, দুপুর ১৫.৫৬ শতাংশ, বিকাল ১৩.৯৫ শতাংশ, সন্ধ্যা ১৩.৫৯ শতাংশ এবং রাত ২৩.৬১ শতাংশ। অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে -১৪৩টি দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। আর সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা হয়েছে, ২৪টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় জানুয়ারি মাসে ২৬টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৪১ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা, এনজিও কর্মী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, বিক্রয় প্রতিনিধি, পোশাক ও নির্মাণ শ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ৫৭ জন শিক্ষার্থী এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য হলো: ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
এ ছাড়া, জানুয়ারিতে নৌ ও রেল দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৪টি নৌ দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়েছেন। ৪১টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, মোটরসাইকেল চালনার নিয়ম-কানুন মেনে চলা, পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সড়ক ও যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা জরুরি।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে জনসচেতনতা, প্রশাসনিক তদারকি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা একত্রিত করলে প্রাণহানির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের মানুষদের নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
ভিওডি বাংলা/জা







