সচিবালয়ে আগুন কেন?

আসাদ পারভেজ
নানারকম সংগ্রামের ভেতরে ইতিহাস রচিত হয়েছে। বিপ্লব সে ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। জুলাই-আগস্ট, ২০২৪-এর বিপ্লব বাংলাদেশকে স্বরূপে ফিরে আসার পথকে উন্মুক্ত করেছে। বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে একটি মৌলিক ও সামাজিক পরিবর্তন, যা তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত সময়ে ঘটে; যখন জনগণ চলমান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জেগে উঠে।
এই যে বাংলাদেশ; তা তো হাজার হাজার বছর ধরে তার স্বকীয়তা বজায় রাখার সংগ্রামে জড়িত। ব্রিটিশদের মতো দানবদের কারণে মাঝেমধ্যে এই মাটি তার স্বাধীনতাকে হরণ হতে দেখেছে। ১৯৭১ সালে এই মাটি পূর্ণরূপ ধারণ করার পরও ভালো থাকতে পারেনি। অবশেষে একটানা সাড়ে ১৫ বছর বাংলাদেশের ওপর যে জুলুমের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, তার অবসান হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে নিজ জাতির ওপর এমন নির্যাতনের খড়গ আর কেউ চালিয়েছেন কি না, জানা নেই।
অতীতে দেশের অধিকাংশ মানুষ সব দিকে চরমভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। দেশের অর্থনীতির চাকা অচল হয়েছে। দৃশ্যমান উন্নয়ন করতে গিয়ে বৈদেশিক দেনায় দেউলিয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় রাষ্ট্র। শিক্ষাঙ্গনের লেজুড়বৃত্তি আগামী প্রজন্মকে অন্ধকারে নিয়ে গিয়েছিল। আমলাতন্ত্রে চরম প্রকারের পচন ধরেছিল। দেশটাকে পুলিশি রাষ্ট্রে সম্পূর্ণরূপে পরিণত করেছিল। দুর্নীতি একেবারে সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়।
অবশেষে, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায় যদিও বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করেছে, কিন্তু বিপদমুক্ত করেনি। কেননা দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্ত এখনো রয়েছে। ভেতর ও বাইরে থেকে দেশকে ধ্বংসকারী বড় ধরনের ন্যক্কারজনক পরিকল্পনায় জড়িত রয়েছেন অনেকে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া আমলা, পুলিশ ও কথিত সুশীলদের চিহ্নিতকরণে বিলম্ব এবং শাস্তিপ্রদানে শীতলতা দেশকে নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।
গত শাসনামলে কিছু দুর্নীতিবাজ আমলা শাস্তির আওতায় ছিলেন। অথচ তারা সে সময়কার শাস্তিকে বিএনপি কিংবা জামায়াত করার কারণে হয়েছে মর্মে কল্পিত মিথ্যা উপস্থাপনকরণে সফল হয়েছেন। বিনিময়ে স্বপদে কিংবা প্রমোশন হয়েছে। এখন আগের সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির খবর যখন বের হতে শুরু করেছে, তখন প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব করেছে কর্তৃপক্ষ। এমন পরিপ্রেক্ষিতেই সচিবালয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ বুধবার, রাত ১টার পর আগুন ধরে এবং দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অতীব জরুরি নথিপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেল! এতে করে জনমনে নানারকম প্রশ্ন দানা বেঁধেছে।
দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে (যুব ও ক্রীড়া; ডাক- টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি; স্থানীয় সরকার; পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়; স্থানীয় সরকার; শ্রম ও কর্মসংস্থান; অর্থ এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়) ঘটল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। আগুন নেভাতে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। ইতিমধ্যে একজন সাহসী ও বীর ফায়ার ফাইটার মারা গেছেন। আমরা তার রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় যে, একই সময়ে একই ভবনের দুই প্রান্তে আগুন জ্বলছে, যা অনেকটাই অস্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, একই ভবনের যথেষ্ট দূরত্বে থাকা দুই পাশে একসঙ্গে আগুন লাগে কীভাবে? এতে নাশকতার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আগুনে পোড়া ভবনে বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র- আন্দোলন থেকে উঠে আসা দুই উপদেষ্টা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া নিজ ফেসবুক আইডিতে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন-'স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে বিগত সময়ে হওয়া অর্থলোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, এখনো জানা যায়নি। আমাদের ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে, তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না'।
সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানে আগুন লাগার বিষয়টি সহজে মেনে নেওয়া যায় না। এতে দেশের সব মানুষ নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন। সচিবালয়ে যারা কর্মরত, তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সচিবালয়ে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও তা পরিচালনায় লোকবলের অভাব আছে বলে মনে হয় না। তাহলে কেন প্রাথমিকভাবেই তা নেভানো গেল না? আমরা আশা করি, সচিবালয়ে আগুন লাগার বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, তারা যোগ্যতার আলোকে ও দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন জাতির সামনে। যদি এতে নাশকতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দোষী ব্যক্তিদের অবশ্যই মুখোশ উন্মোচন করে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
লেখক: গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক







