সড়কে আতঙ্কের নাম অটোরিকশা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আতঙ্কের নাম হলেও এ খাতের বাণিজ্য এখন রমরমা। ঝুঁকিপূর্ণ এ যানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। মূলত গত ১৫ বছরে এ বাণিজ্য ফুলেফেঁপে উঠেছে সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার সুযোগে। এমন তথ্য জানিয়ে পরিবহন বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ করে অটোরিকশা বন্ধ হলে বহু পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তাই নিতে হবে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ।
সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কিছু এলাকাতে অটোরিকশা বানানো কারখানা ঘুরে এমনটাই দেখা গেছে।
তিন চাকার রিকশায় ব্যাটারি আর মোটর লাগিয়ে কয়েকগুণ বেশি গতিতে রাজপথে অনেকটা হাওয়ার বেগেই উড়ে চলা অটোরিকশা সড়ক নিরাপত্তায় এখন আতঙ্কের নাম। নেই কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা হিসাব। বেসরকারি হিসাবে ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অটোরিকশার সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ছাড়িয়েছে ৫০ লাখে।
ঢাকার বুকে বেশ কয়েকটি এলাকা ঘিরে গড়ে উঠেছে কয়েকশ অটোরিকশা তৈরির ওয়ার্কশপ। মুগদা, মান্ডা, গোড়ান, কামরাঙ্গীরচর এবং কেরানীগঞ্জের ছোট-বড় এসব ওয়ার্কশপে তৈরি হচ্ছে অটোরিকশার বডি। কেরানীগঞ্জের এক খেজুরবাগান এলাকাতেই অর্ধশত ওয়ার্কশপে তৈরি হচ্ছে শত শত অটোরিকশা।
রাজধানীর এক অটোরিকশা তৈরির মিস্ত্রি জানান, কাজের যখন চাপ থাকে, তখন ১০ থেকে ১২টা বানানো হয়। আরেকজন জানান, আমাদের টার্গেট থেকে ঢাকার বাইরে এ অটোরিকশা বিক্রি করা। ঢাকায় মুলত এতটা চাহিদা নেই। কেরানীগঞ্জের ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০ এর মত কারখানা আছে এ অটোরিকশা বানানোর। প্রায় ৫ থেকে ৬শো মানুষের কর্মসংস্থান হয় এখানে।
অটোরিকশার প্রধান যন্ত্রাংশ ব্যাটারি ও মোটরের বিশাল বাজার রাজধানীর কমলাপুর স্টেডিয়াম মার্কেটে। রীতি মতো এলসি খুলে, শুল্ক দিয়ে যারা অটোরিকশার যন্ত্রাংশ আমদানি করছেন তাদের প্রশ্ন, এ যান অবৈধ হলে যন্ত্রাংশ আমদানিতে কেন দেয়া হচ্ছে অনুমতি?
এক ব্যবসায়ী জানান, এই অটোরিকশার যন্ত্রাংশগুলো আসে চায়না (চীন) থেকে। শুধু ব্যাটারিগুলো এখানে এসে লাগানো হয়। এই গাড়ির সব পার্টস চায়না থেকে আমদানি করতে হয়।
আরেক ব্যবসায়ী জানান , সরকার এই খাত থেকে রাজস্ব পায় অন্য খাত থেকে বেশি। অন্য খাত থেকে এত বেশি পায় না যাচাই করে দেখতে পারেন- সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেন।
অটোচালকদের বেশিরভাগই রিকশা কিনেছেন বড় বড় এনজিওর দেয়া ঋণের টাকায়। এ যান নিষিদ্ধ হলে একদিকে ঋণের বোঝা অন্যদিকে পরিবার নিয়ে অকুল পাথারে পড়বেন চালকরা।
এক চালক জানান, ‘আশা’ সমিতি থেকে টাকা তুলেছি। কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করতে হয়। আরেকজন জানান ৮০ হাজার টাকা লোন নিয়ে এ অটো রিকশা কিনেছে। চালাতে না পারলে ঋণ শোধ দিবো কোথা থেকে।
বুয়েটের সড়ক-পরিবহন এ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান জানান, ১৫ বছরে অটোরিকশার বাজার বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। চাইলেই এখন আর এ বাহনকে নিষিদ্ধ করার উপায় নেই।
তিনি বলেন, সংখ্যার দিক থেকে অটো রিকশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ঢাকা শহরে ৮ থেকে ১০ লাখ এ রিকশা চলছে। ৫ আগস্টের পরে ঢাকা শহরে আশপাশের যেসব মফঃস্বল শহর আছে, আমার ধারনা সেখান থেকে অসংখ্য রিকশা ঢাকা শহরে ঢুকে পড়েছে। এই দায়টা এখন শুধুমাত্র কিস্তি নিয়ে ঋণ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা যারা কিনে সড়কে নেমেছেন, তাদের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই।
অটোরিকশা নিষিদ্ধ নয়; বরং এটির ত্রুটি সংশোধনের জন্য মোডিফিকেশন আর সড়কে চলাচলের বিধিনিষেধের নীতিমালা প্রণয়নের দিকে জোর বিশ্লেষক এবং ব্যবসা সংশ্লিষ্টদের।
হাদিউজ্জামান বলেন, অটোরিকশার ব্যাপকতা যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তাহলে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে এটা করতে হবে। রাতারাতি হঠাৎ করে যদি বলা হয় যে, ব্যাটারিচালিত রিকশা সড়কে নামবে না; এটা আসলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
এছাড়া অটোরিকশায় পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি এবং ব্যাটারি ডাম্পিং নীতিমালা প্রণয়নের ওপরেও জোর দেন তিনি।







