আইএলও সম্মেলনে শিমুল বিশ্বাস
এআই যুগে শ্রমিক অধিকার রক্ষায় বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান

জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশের শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়ে শ্রমিক অধিকার, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব, অভিবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
সম্মেলনে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে বিশ্ব শ্রমবাজারে তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘ কার্যালয়ের টেম্পাস হলে ৮ জুন অনুষ্ঠিত অধিবেশনে তিনি বক্তব্য দেন।
সোমবার (৮ জুন) বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে এবং বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে দেওয়া ওই বক্তব্যে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শ্রমবাজারের পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন। শিমুল বিশ্বাস তার বক্তব্যের শুরুতে আইএলও মহাপরিচালকের উপস্থাপিত প্রতিবেদনকে সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ন্যায়বিচার, সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সবার জন্য শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার যে আদর্শ নিয়ে আইএলও কাজ করছে, বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজ সেই মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগকে তিনি শ্রমজীবী মানুষের প্রতি জনগণের আস্থা ও সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন। বক্তব্যে শ্রমিকদের সংগঠন গঠন এবং সম্মিলিত দরকষাকষির অধিকারের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ এবং ন্যায্য দাবি উত্থাপনের পরিবেশ নিশ্চিত না হলে টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শ্রমিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শিমুল বিশ্বাস বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতি মানবসভ্যতার জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক খাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে নারী শ্রমিক, তরুণ কর্মজীবী এবং কম দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকদের ওপর।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে বিপুল জনগোষ্ঠী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তাই দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অধিক বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির আকার এবং বিদেশে কর্মরত বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিকের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দেশের অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অভিবাসী কর্মীদের ভূমিকাও অপরিসীম।
এ কারণে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারণ জরুরি। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জ্ঞান বিনিময়ভিত্তিক একটি বৈশ্বিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এতে প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমবে এবং শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। ডিজিটাল বিভাজন ও দক্ষতার ঘাটতিকে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন শিমুল বিশ্বাস। তিনি বলেন, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এআই প্রযুক্তিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা না গেলে বৈশ্বিক বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে।
এ সময় তিনি নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি, শ্রমিকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, শ্রমিকের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে তিনি সতর্কবার্তাও দেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত হওয়া উচিত, এমন কোনো ব্যবস্থার জন্য নয় যা মানব মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে কিংবা সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়।
প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নীতিনির্ধারণী সমন্বয় প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমান সময়ে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অর্থনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অ্যাপভিত্তিক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনো পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা পান না। তাদের অধিকার, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রণয়ন প্রয়োজন।
এ প্রেক্ষাপটে “প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে শোভন কাজ” সংক্রান্ত আইএলওর প্রস্তাবিত কনভেনশনকে তিনি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় দেশগুলোর মধ্যে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি আইএলওর তিনটি কনভেনশন অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে দু’টি মৌলিক কনভেনশন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি এটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। শ্রম আইন আধুনিকায়ন, আইনি সুরক্ষা সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালীকরণ এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক ভূমিকা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তার মতে, শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা গেলে শিল্পসম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে।বক্তব্যের শেষাংশে শিমুল বিশ্বাস সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও টেকসই শ্রমব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। জেনেভায় অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তার বক্তব্য শ্রমিক অধিকার, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে বৈশ্বিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন তিনি।
ভিওডি বাংলা/জা







