রাজশাহীতে বর্ষার বৃষ্টি কমেছে ৩৪ শতাংশ

রাজশাহী অঞ্চলে গত প্রায় পাঁচ দশকে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে গড় তাপমাত্রা এবং দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এসব পরিবর্তনের ফলে দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, যা কৃষি উৎপাদন, জীবিকা এবং দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ক্লিনার ওয়াটার -এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। “চরম জলবায়ু ও জলবায়ুজনিত পানিসংকটের মডেলিং: বাংলাদেশের রাজশাহীতে জীবিকার ওপর প্রভাব” শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের একদল গবেষক। গবেষণায় স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য, আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি উপাত্ত, ভূগর্ভস্থ পানির রেকর্ড এবং রাজশাহীর ১৩টি উপজেলার ৩৮৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত মাঠ জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে রাজশাহীতে বর্ষাকালে গড় বৃষ্টিপাত ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ কয়েক দশকে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাও উদ্বেগজনক। গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে বছরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার দিনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ২০১৮ সালে যেখানে এমন অতিরিক্ত গরম দিনের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩ দিন, ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে তা ২০৭৮ সালের মধ্যে প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থাও ক্রমাগত অবনমনশীল। গবেষণা অনুযায়ী, গত ৩৫ বছরে রাজশাহীতে পানির স্তর গড়ে ৩ দশমিক ৭৮ মিটার নিচে নেমে গেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির গড় গভীরতা ছিল ১১ দশমিক ৬৬ মিটার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৪৪ মিটারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) আওতাধীন এলাকায় কৃষিকাজে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণেই এই পরিস্থিতি আরও দ্রুত অবনতি হচ্ছে।
মাঠ জরিপের ফলাফলও একই চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬১ শতাংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, পানির সংকট তাদের আয়ের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষিনির্ভর জীবিকা, বিশেষ করে ধানচাষ, এই সংকটের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ৯৫ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি সংগ্রহ করতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এই সংকট শুধু প্রাকৃতিক নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সঙ্গেও যুক্ত। কৃষিতে অতিরিক্ত পানি-নির্ভর ফসল উৎপাদন, বিশেষ করে ধানচাষের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি। পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যেই রাজশাহী অঞ্চলে পানিসংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
ভিওডি বাংলা/মো. রমজান আলী/জা







