রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সহায়তা বাড়াল ফিনল্যান্ড
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা এবং সুরক্ষা অব্যাহত রাখতে ফিনল্যান্ড সরকার ২০ লাখ ইউরো সাহায্য দিচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। নতুন বরাদ্দকৃত এই অর্থ দিয়ে ইউএনএইচসিআর দক্ষতা বৃদ্ধি ও টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরির মতো কাজে যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণ করতে পারবে; যেসব খাতে এত দিন পর্যাপ্ত অর্থের অভাব ছিল।
মিয়ানমারে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসার প্রায় এক দশক পর, ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখনও বাংলাদেশে বসবাস করছে। জীবিকার সীমিত সুযোগের কারণে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা মূলত ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে মাত্র ২৩ শতাংশ শরণার্থী পরিবার কাজের-বিনিময়ে-অর্থ এর মাধ্যমে আয় করেছে, যা একমাত্র অনুমোদিত আনুষ্ঠানিক জীবিকামূলক কার্যক্রম। ৪২ শতাংশ পরিবারের আয়ের উৎস ছিল অস্থায়ী ও অনিশ্চিত। আর, ৩৫ শতাংশ পরিবারের কোনো আয়ের উৎসই ছিল না। তারা সম্পূর্ণভাবে সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
তহবিল হ্রাস পাওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন: নারী ও মেয়ে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকে আসা প্রায় দেড় লাখ নতুন আগতরা, যারা ইতিমধ্যে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে জায়গার অভাবে এখনও আশ্রয়হীন।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের রিপ্রেজেন্টেটিভ ইভো ফ্রেইসেন বলেন, "রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার প্রচেষ্টা এখন একটি নাজুক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে — যা ক্রমহ্রাসমান তহবিল, ক্যাম্পের অবনতিশীল পরিস্থিতি, ক্রমবর্ধমান সুরক্ষা ঝুঁকি এবং মিয়ানমারে চলমান অস্থিতিশীলতাই এর প্রমাণ। এই পরিস্থিতিতে ফিনল্যান্ডের বর্ধিত প্রতিশ্রুতি তাদের অসাধারণ উদারতার প্রমাণ।"
তিনি আরও বলেন, "মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করার ক্ষেত্রে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্বকে এটি পুনরায় নিশ্চিত করে।"
নয়াদিল্লিতে ফিনল্যান্ড দূতাবাসের অন্তর্বর্তীকালীন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মারি আহমেদ বলেন, "ফিনল্যান্ড বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। বাস্তুচ্যুতির প্রায় এক দশক পরও রোহিঙ্গা জনগণ এখনও তাদের জীবন পুনর্গঠনের সুযোগের অপেক্ষায়।" তিনি আরও বলেন, "প্রাথমিক সহায়তার পাশাপাশি আমাদের রোহিঙ্গাদের একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে — দক্ষতা ও স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলায় সহায়তা, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের দুর্দশা যেন বৈশ্বিক দৃষ্টি থেকে হারিয়ে না যায় তা নিশ্চিত করা।"
ফিনল্যান্ডের এই অনুদান এমন এক সময়ে এলো যখন জাতিসংঘ ও এর মানবিক অংশীদাররা নবায়িত আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছে। গত ২০ মে তারিখে তারা রোহিঙ্গা মানবিক সংকটের জন্য যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) ২০২৬ সালের হালনাগাদ সংস্করণ উপস্থাপন করেছে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক এই পরিকল্পনায় শরণার্থী ও স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীসহ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আবেদন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জেআরপি থেকে ২৬ শতাংশ কম এই আবেদন শুধু জীবন রক্ষাকারী সহায়তা টিকিয়ে রাখার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তাটুকুই পূরণ করে। বছরের মাঝামাঝিতে এসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদার সহায়তায় এই আবেদনের ইতিমধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থায়ন হয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় ফিনল্যান্ড বহু বছর ধরে মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালে ফিনল্যান্ড ইউএনএইচসিআর এর মূল তহবিলে আরও ৭০ লাখ ইউরো দিচ্ছে, যা সংস্থাটি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করতে পারবে। এই অর্থ দিয়ে ইউএনএইচসিআর হঠাৎ কোনো বিপর্যয় দেখা দিলে দ্রুত সাড়া দিতে পারবে এবং যেসব সংঘাত তেমন আলোচনায় আসে না, সেখানেও কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে, শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেন পরিত্যক্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে এবং মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে জীবন যাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও অর্থ সহায়তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ভিওডি বাংলা/বিন্দু









মন্তব্য