পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার দ্বিতীয় দফার ভোট : বুথে বুথে মমতার টহল, পিছিয়ে নেই শুভেন্দুও

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই চলছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার দ্বিতীয় দফার ভোট। এক সপ্তাহ আগে প্রথম দফার ভোট শেষ হওয়ার পর বুধবার (২৯ এপ্রিল) দ্বিতীয় দফায় রাজ্যের সাতটি জেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এ দফায় কলকাতার পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া ও নদিয়ায় সকাল ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ভোট চললেও বিভিন্ন কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন গোলযোগ ও ইভিএম বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সকাল থেকেই বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ভোটাররা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন। বেলা ১১টা পর্যন্ত গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে গলসিতে, প্রায় ৪৭.৮৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে মন্তেশ্বর, যেখানে ভোটের হার ৪৬.৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে মহেশতলায় ভোটের হার তুলনামূলকভাবে কম, ৩৩.৫ শতাংশ। ভবানীপুরে ৩৭.২৭ শতাংশ এবং ভাঙড়ে ৩৪.২৮ শতাংশ ভোট পড়েছে।
দ্বিতীয় দফার ভোটে সবচেয়ে বেশি নজর ভবানীপুর কেন্দ্রে। এখানে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। ভোট শুরুর পর থেকেই দুই প্রার্থীই এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকালে ভবানীপুরের বিভিন্ন বুথ পরিদর্শন করেন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনী নির্দিষ্টভাবে তৃণমূল কর্মীদের লক্ষ্য করে আচরণ করছে। তিনি আরও বলেন, তিনি সারারাত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সব তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর দাবি, ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে এবং মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটারদের রেকর্ড সংখ্যায় ভোটদানের আহ্বান জানান। তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন এবং বিশেষভাবে নারী ও যুব ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করেন। একইভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও ভোটারদের প্রতি বেশি সংখ্যায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি বাংলার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে এই দফায় ১৪২টি আসনের ভাগ্য নির্ধারণ হচ্ছে। এর আগে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ভোট গণনা অনুষ্ঠিত হবে ৪ মে এবং ফলাফল প্রকাশ করা হতে পারে ৫ মে।
রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কংগ্রেস, সিপিএম, আইএসএফসহ অন্যান্য দলও নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
২০১১ সালে দীর্ঘ ৩৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর টানা তিনবার বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে রাজ্যে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে দলটি। তবে এবারের নির্বাচনে লড়াই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৫টি আসনে জয় পায়, আর বিজেপি ৭৭টি আসন লাভ করে। তবে এবার দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন ইস্যুকে সামনে রেখে বিজেপি জোরালো প্রচার চালিয়েছে। অন্যদিকে শাসকদল কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখার অভিযোগ তুলেছে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও নির্বাচন কমিশন ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে ভোটকেন্দ্রগুলোতে। বিশ্লেষকদের মতে, নজিরবিহীন এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে রাজ্যজুড়ে ভোট পরিস্থিতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সব মিলিয়ে দ্বিতীয় দফার ভোটকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/জা







