সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দফায় দফায় ঘুষ দিতে হয় ৫ বন কর্মকর্তাকে

সাতক্ষীরার পশ্চিম সুন্দরবন রেঞ্জে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা–কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, সুন্দরবনে প্রবেশ, পাস সংগ্রহ এবং অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ পেতে তাদের দফায় দফায় অর্থ দিতে হয়। এতে বনজীবীদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলেদের অভিযোগ, বনদস্যুদের চাঁদা ও দস্যুতা থেকে বাঁচতে গিয়ে তারা একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বন বিভাগের বিভিন্ন স্তরে ঘুষ দিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ফলে সুন্দরবন নির্ভর জীবিকা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
স্থানীয় সূত্র ও জেলেদের অভিযোগ অনুযায়ী, সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি চক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে কয়েকটি স্টেশন পর্যায়ের কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বুড়িগোয়ালিনী, কোবাদক, কৈখালী ও কদমতলা স্টেশনের একাধিক কর্মকর্তা জেলেদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায় করেন। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক, কোবাদক স্টেশন কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান, কৈখালী স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ ও কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা মনিরুল কবিরের নামও স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জে প্রায় ২ হাজার ৯০০টির মতো বনজীবী লাইসেন্স (বিএলসি) রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মাছ আহরণ এবং ১ হাজার ৪০০টি কাঁকড়া আহরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই বিএলসি নিয়ন্ত্রণ, নবায়ন ও পাস ইস্যু ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই মূলত ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠছে বলে দাবি করেন স্থানীয় জেলেরা।সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায়
একাধিক স্টেশন ও টহল ফাঁড়ি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কদমতলা, কৈখালী, বুড়িগোয়ালিনী ও কোবাদক স্টেশনের অধীনে বিভিন্ন ফাঁড়ি ও টহল পোস্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ফাঁড়ি ব্যবহার করে বনাঞ্চলে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং অভয়ারণ্যের নিষিদ্ধ এলাকাতেও অর্থের বিনিময়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, মানিকচড়া, পান্তামারি, খাজুর দানা, তালপটি, বালি ঝাকি, হেতাল বুনিয়া সহ একাধিক সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অর্থের বিনিময়ে কিছু জেলে সেখানে প্রবেশের সুযোগ পান।
শ্যামনগরের গাবুরা, কৈখালী ও আশপাশের এলাকার একাধিক জেলে জানান, খোলা বনে মাছ ও কাঁকড়া কম পাওয়ায় তারা অভয়ারণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
একজন জেলে অভিযোগ করে বলেন, পাস থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি স্টেশনে টাকা দিতে হয়। নৌকা প্রতি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা না দিলে সুন্দরবনে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আরেক জেলে জানান, ১৫ দিনের একটি অভিযানে নৌকা অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকারও বেশি খরচ হয় শুধু বন বিভাগের বিভিন্ন স্তরে দিতে গিয়ে। এতে অনেক সময় মাছ বিক্রির আয় দিয়ে খরচও ওঠে না।
তাদের অভিযোগ, বনদস্যুদের পাশাপাশি বন বিভাগের অর্থ আদায় তাদের ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের জাল ও নৌকার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যেমন—
এছাড়া পাস ইস্যু করার সময় “ডিউটি খরচ” ও “লাইন খরচ” নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, টহল ফাঁড়ি পর্যায় থেকে শুরু করে স্টেশন অফিস পর্যন্ত একাধিক ধাপে অর্থ আদায় করা হয়।
অভয়ারণ্য প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক
সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ধরা ও কাঁকড়া আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে জেলেদের দাবি, বাস্তবে অর্থের বিনিময়ে এসব এলাকায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো নৌকা ধরা পড়লে পরে অর্থের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরবন থেকে আহরিত মাছ ও কাঁকড়ার ওপর নির্ধারিত হারে রাজস্ব প্রদান করতে হয়। কাঁকড়া, সাদা মাছ, রূপচাঁদা, ভেটকি ও অন্যান্য প্রজাতির জন্য আলাদা আলাদা কুইন্টাল ভিত্তিক ফি নির্ধারিত রয়েছে।
কিন্তু জেলেদের দাবি, বাস্তবে এই নিয়মের বাইরে গিয়ে পাস সই ও প্রবেশের সময় অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়, যা সরকারি হার থেকে অনেক বেশি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, অভয়ারণ্যে কোনোভাবেই মাছ বা কাঁকড়ার নৌকা প্রবেশের সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, যদি কেউ নিয়ম ভেঙে অর্থের বিনিময়ে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়, তাহলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন এবং বলেন, বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ভিওডি বাংলা/আবদুল্লাহ আল মামুন/জা







