পহেলা বৈশাখ ধর্মীয় নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ : আবদুস সালাম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, পহেলা বৈশাখ কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেলা, বাউল গান, যাত্রা ও নাটকের মতো ঐতিহ্যবাহী উপাদান একসময় আমাদের জীবনের অংশ ছিল, কিন্তু এখন সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে—এগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর তোপখানা রোডের বাশিকপ মিলনায়তনে বাংলা বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উপলক্ষে আয়োজিত বৈশাখ আবহন উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাখদুমা নার্গিস (প্রতিষ্ঠানের সভাপতি), বিশেষ অতিথিবৃন্দ, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকসহ উপস্থিত সুধীজন এবং শিশু-কিশোরদের শুভেচ্ছা জানান।
শুরুতেই সবাইকে অগ্রিম বৈশাখের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন বছর সবার জীবনে একটি সুন্দর আগামী বয়ে আনুক। গত বছরের সব ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে মুক্তি মিলুক এবং মানুষ যেন একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে চলাফেরা, মতপ্রকাশ ও দেশপ্রেম চর্চা করতে পারে।
আবদুস সালাম বলেন, পহেলা বৈশাখ আমরা আবহমানকাল ধরে পালন করে আসছি। দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি বর্ষপঞ্জির ব্যবহার বেশি হলেও বাংলা বর্ষ ও এর সঙ্গে জড়িত কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে আমরা যথাযথভাবে ধারণ করি না। অথচ এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই বাঙালির প্রকৃত পরিচয়; যার সাংস্কৃতিক শেকড় নেই, তার কিছুই নেই।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নিজেদের ভাষা, পোশাক ও সংস্কৃতি ধরে রেখেছে। জাতিসংঘের অধিবেশনেও অনেকে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অংশ নেন এবং নিজের ভাষায় কথা বলতে গর্ববোধ করেন। এ বিষয়গুলো থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি—যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চলবে এবং দেশের মালিকানা জনগণের হাতে থাকবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই চেতনা পুরোপুরি ধরে রাখা যায়নি, ফলে অপশক্তির উত্থান ঘটেছে। এ জন্য নিজেদেরই দায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারতাম এবং মুক্তিযুদ্ধকে দলীয়করণের বাইরে রেখে সার্বজনীনভাবে ধারণ করতে পারতাম, তাহলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিতে পারত না।
তিনি আরও বলেন, এখনো সময় আছে—তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং বাঙালি কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মেধাবী তরুণ-তরুণীদের বিদেশমুখী হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে মো. আবদুস সালাম বলেন, অনেকেই মনে করেন দেশটি তাদের জন্য নিরাপদ নয়। কিন্তু এটি কোনো দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। মেধা ও দেশপ্রেম—এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এটা তোমার দেশ, এটা আমার দেশ। ভালো-মন্দ যাই থাকুক, এটিই আমাদের জন্মভূমি। তিনি বলেন, যেমন আমরা মাকে ভালোবাসি, তেমনি জন্মভূমিকে ভালোবাসতে হবে। দেশের মানুষ, প্রকৃতি, নদী-নালা ও ফসলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রকৃত দেশপ্রেম গড়ে ওঠে।
তিনি বলেন, দেশপ্রেমিক ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকলে কোনো দায়িত্বই দেশের কল্যাণে কাজে আসবে না।
মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকে এটিকে খাটো করে দেখতে চান বা অন্য ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধই আমাদের জন্মভিত্তি; এটিকে অস্বীকার করা মানে দেশের অস্তিত্ব অস্বীকার করা। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক।
রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, মেধাবীরা যদি রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, তাহলে সঠিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে না। তাই সচেতনভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে হবে।
নিজের দেশকে ভালো করার দায়িত্ব নিজেরই উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এ পরিবর্তন সম্ভব।







