সক্ষমতা আছে, জ্বালানি নেই: বিদ্যুতে কৃচ্ছসাধন নীতি নিচ্ছে সরকার

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের উচ্চ চাহিদার মাস চলমান এপ্রিল এবং সামনের মে মাস নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে, যখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ সীমিত থাকায় লোডশেডিং অব্যাহত থাকতে পারে।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়াচ্ছে যে, সরকার এপ্রিল মাসজুড়ে জ্বালানি মজুদ থাকার কথা বললেও বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে কৃচ্ছসাধন নীতি গ্রহণ করছে নতুন সরকার। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা গেছে শনিবার (৪ এপ্রিল) সরকারি ছুটির দিনে। সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪,৩৫০ মেগাওয়াট। দিনের বেলায় প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট এবং রাতে এক পর্যায়ে ১,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বে পড়েছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সংকট সৃষ্টি করছে।
পিডিবি জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ যদি ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, তাহলে উৎপাদন ৪,৫০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে।
পিডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এপ্রিল-মে মাসে দেশে সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে ১৮,৫০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে মোট উৎপাদন হতে পারে মাত্র ১৬,২০০ মেগাওয়াট। ফলে সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট। এর প্রভাব শিল্প খাতেও পড়তে শুরু করেছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং ক্ষুদ্র শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে।
সরকার ইতোমধ্যে লোডশেডিং কমাতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সন্ধ্যা ৭টার পর শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিসের কাজের সময় এক ঘণ্টা কমানো হয়েছে। পাশাপাশি জনগণকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সচেতন করতে প্রচার কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর আবহাওয়ার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এপ্রিলে একাধিক তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে এবং বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে যদি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে এবং তাপমাত্রা সহনীয় থাকে, সেক্ষেত্রে চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান জরুরি। তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ বাড়ানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ করা প্রয়োজন। এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস কমানো এবং দক্ষ পরিচালনা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঠামোতে মোট ১৩৬টি কেন্দ্র সক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, যার মধ্যে মোট ইনস্টলড ক্ষমতা প্রায় ৩২,৩৩২ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষমতা ১২,১৯৪ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ৬,৬০৪ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৬,৪৪২ মেগাওয়াট এবং ডিজেলভিত্তিক ২৯০ মেগাওয়াট। এছাড়া হাইড্রো কেন্দ্র আছে ২৩০ মেগাওয়াট, আমদানি করা বিদ্যুৎ ১,১৬০ মেগাওয়াট এবং নবায়নযোগ্য উৎস (সৌর ও বায়ু) ৫৯৫ মেগাওয়াট। তবে তেলের ওপর নির্ভরশীল কেন্দ্রগুলো সীমিতভাবে কাজ করছে, যার ফলে মোট ৩,৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ৮টি ডিজেল-পাওয়ার প্ল্যান্টের মধ্যে মাত্র ৩টি কার্যক্রম চালু রয়েছে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/আরকেএইচ/এমএস







