হার্ডিঞ্জ ব্রিজের আদলে নতুন রেলসেতুর উদ্যোগ

বাংলাদেশের দীর্ঘতম ও ঐতিহাসিক রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এর আদলে একই স্থানে একটি নতুন আধুনিক রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রাথমিক সমীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মিত হলে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের মধ্যে রেল যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
১৯১৫ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি ও খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলাকে সংযুক্ত করেছে। প্রায় ১১০ বছরের পুরোনো এই সেতুটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সেতুটি দেশের রেল যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সময়ের সাথে সাথে এর কাঠামোগত সক্ষমতা ও ফিটনেস কমে এসেছে।
বর্তমানে একক লাইনের এই রেলসেতু দিয়ে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় মাত্র ২৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করতে পারে এবং সর্বোচ্চ ২৫ টন এক্সেল ভার বহন সম্ভব। আধুনিক রেল ব্যবস্থার প্রয়োজনের তুলনায় যা অত্যন্ত অপ্রতুল। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সমান্তরালে একই নকশায় একটি নতুন ডাবল লাইন রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
প্রস্তাবিত নতুন রেলসেতুটির দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার (১,৭৬০ মিটার)। এটি স্টিল ওয়ারেন ব্রিজ কাঠামোয় নির্মিত হবে এবং ডাবল লাইনের ট্র্যাক থাকবে। সমীক্ষা অনুযায়ী, সেতুটি মোট ১৬টি স্পানের ওপর নির্মিত হবে। প্রতিটি স্পানের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১১০ মিটার, যাতে পদ্মা নদীতে নৌযান চলাচলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। নতুন সেতু চালু হলে ট্রেন স্বাভাবিক ও অধিক গতিতে চলাচল করতে পারবে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সেতু নির্মাণের আগে নদীর পানি প্রবাহ, পরিবেশগত প্রভাব এবং অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক গতি ও পরিবেশ অক্ষুন্ন রেখে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করাই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ ও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের সংযোগ আরও আধুনিক ও কার্যকর হয়ে উঠবে। প্রকল্পের আওতায় পাকশি ও ভেড়ামারা রেলস্টেশন নতুন আঙ্গিকে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে যাত্রীসেবা আরও উন্নত ও আরামদায়ক করা যায়।
এ বিষয়ে পাকশি স্টেশন ম্যানেজার সুমি খাতুন বলেন, “হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। সেতুর মেয়াদ শেষের পথে থাকায় এখন ধীরগতিতে ট্রেন চলাচল করছে। নতুন সেতু নির্মিত হলে ট্রেনের গতি বাড়বে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহন অনেক সহজ হবে। আমরা চাই দ্রুত যেন এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়।”
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, “বর্তমান হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেতুটির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে ট্রেনের গতি ও লোড ক্যাপাসিটি কম। তাই একই আদলে একটি নতুন ডাবল লাইন রেলসেতু নির্মাণের জন্য আমরা সমীক্ষা চালাচ্ছি। নতুন সেতু হলে ট্রেনের গতি বাড়বে, ভার বহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং রেল যোগাযোগ আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে। পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই কাজ করা হবে।”
কর্তৃপক্ষের আশা, প্রস্তাবিত রেলসেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হলে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হবে এবং পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
ভিওডি বাংলা/মোঃ রমজান আলী/আ







