যেখানে মেধার চেয়ে চাটুকারিতা গুরুত্ব পায়

সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি বা সৃজনশীলতার মূল চালিকাশক্তি হলো মেধা, পরিশ্রম ও সততা। কিন্তু যখন কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা রাষ্ট্রব্যবস্থায় মেধার পরিবর্তে চাটুকারিতা বা তোষামোদ মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে ধীরে ধীরে অযোগ্যতা, স্থবিরতা এবং অবক্ষয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়। ইতিহাস বলছে, যে সমাজ মেধাকে অবমূল্যায়ন করে এবং চাটুকারদের প্রাধান্য দেয়, সে সমাজ কখনো দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
চাটুকারিতা মূলত একটি মানসিক প্রবণতা, যেখানে সত্যকে আড়াল করে ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করাই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। এটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে ক্ষতি কম, কিন্তু যখন এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন তার প্রভাব মারাত্মক হয়ে ওঠে।
যেখানে চাটুকারিতা মূল্য পায়, সেখানে প্রকৃত মেধাবীরা ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়ে। কারণ তারা দেখে থাকে, যোগ্যতা নয় বরং কে কতটা প্রশংসা করতে পারে, সেটিই পদোন্নতি বা সুযোগ পাওয়ার মূল চাবিকাঠি। ফলে মেধাবীরা হয় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যায়, নয়তো নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এটি 'ব্রেইন ড্রেইন' বা মেধাপাচারের পথ তৈরি করে।
একটি দেশের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার দক্ষ মানবসম্পদ। কিন্তু যখন সেই সম্পদকে মূল্য দেওয়া হয় না, তখন তারা অন্যত্র সুযোগ খুঁজে নেয়। এতে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চাটুকারিতার সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো—অযোগ্যরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপূর্ণ স্থানে বসে যায়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, নীতি নির্ধারণ করে, প্রকল্প পরিচালনা করে। কিন্তু যেহেতু তাদের সক্ষমতা সীমিত, তাই সিদ্ধান্তগুলোও হয় দুর্বল, অপরিকল্পিত এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর। এর ফলাফল হয় দুইভাবে। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা কমে যায়। দ্বিতীয়ত, দক্ষ ব্যক্তিরা হতাশ হয়ে পড়ে এবং কর্মপরিবেশ নষ্ট হয়। একসময় পুরো ব্যবস্থাটিই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
মেধার মূল্যায়ন না হলে উদ্ভাবন থেমে যায়। কারণ নতুন কিছু তৈরি করতে হলে স্বাধীন চিন্তা, যুক্তি এবং দক্ষতার প্রয়োজন। কিন্তু চাটুকারিতার পরিবেশে কেউ সত্য কথা বলতে সাহস পায় না। ভুল সিদ্ধান্ত হলেও সবাই প্রশংসা করে, যাতে কর্তৃপক্ষ অসন্তুষ্ট না হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান বা সমাজে সৃজনশীলতার পরিবর্তে আনুগত্যই প্রধান গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি জাতিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়।
বর্তমান বিশ্ব প্রতিযোগিতামূলক। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিক্ষা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা বাড়ছে। যেখানে মেধা মূল্যায়িত হয়, সেখানে দ্রুত উন্নতি ঘটে। আর যেখানে চাটুকারিতা মূল্যায়িত হয়, সেখানে অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়। কারণ দক্ষতার পরিবর্তে আনুগত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠান বা দেশ অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে।
চাটুকারিতার সংস্কৃতি শুধু অযোগ্যতা তৈরি করে না, এটি নৈতিক অবক্ষয়ের পথও খুলে দেয়। যখন যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ বেশি মূল্য পায়, তখন মানুষ নৈতিকতা ছেড়ে সুবিধাবাদী হয়ে যায়। এতে দুর্নীতি বাড়ে, স্বচ্ছতা কমে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।
একসময় এই সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে সত্য বলা বিপজ্জনক হয়ে যায়। সবাই নিরাপদ থাকার জন্য চুপ থাকে বা প্রশংসা করে। এতে নেতৃত্বের কাছেও বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক তথ্য পৌঁছায় না।
অনেকে মনে করেন, চাটুকাররা শুধু নিজের সুবিধা নেয়, কিন্তু এতে নেতৃত্বের কোনো ক্ষতি হয় না। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। চাটুকারদের দ্বারা ঘেরা নেতৃত্ব বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ সত্যিকারের সমালোচনা বা সতর্কবার্তা তাদের কাছে পৌঁছায় না। ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে, যেখানে চাটুকারদের কারণে নেতারা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের ও দেশের ক্ষতি করেছেন।
এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি।
প্রথমত, মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। নিয়োগ, পদোন্নতি ও সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কেউ যেন যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করলে শাস্তির ভয় না পায়।
তৃতীয়ত, নেতৃত্বের মানসিকতা পরিবর্তন করা। একজন সত্যিকারের নেতা প্রশংসাকারীর চেয়ে সমালোচককে বেশি গুরুত্ব দেন।
চতুর্থত, সামাজিকভাবে চাটুকারিতাকে নেতিবাচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। যখন সমাজই এটিকে অপছন্দ করবে, তখন এর বিস্তার কমবে।
যেখানে মেধার চেয়ে চাটুকারিতা গুরুত্ব পায়, সেখানে ভালো কিছু তৈরি হয় না; এটি শুধু একটি কথার কথা নয়, বরং বাস্তব সত্য। সেখানে অযোগ্যরা প্রতিষ্ঠিত হয়, যোগ্যরা হারিয়ে যায়, সমাজ পিছিয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, যেখানে মেধা, সততা ও পরিশ্রম মূল্য পায়, সেখানে অগ্রগতি অনিবার্য। তাই উন্নত সমাজ গড়তে হলে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত, চাটুকারিতার সংস্কৃতি ভেঙে মেধার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, সে জাতি কাকে সামনে নিয়ে যায়, চাটুকারকে নাকি মেধাবীকে।
লেখকঃ রিয়াজুল হক, অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
ভিওডি বাংলা/ আ
নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। ভিওডি বাংলা সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, ভিওডি বাংলা কর্তৃপক্ষের নয়।



