দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান:
বিএনপির ২ নেতার সঙ্গে 'র' কর্মকর্তার বৈঠকের ছবি এআই-এর

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া এক পোস্টে দাবি করা হয়, বিএনপির দুই কেন্দ্রীয় নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আব্দুল আউয়াল মিন্টু ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর একজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করছেন। ফেসবুকে Shafin Rahman নামে এক ব্যক্তি ৪টি ছবি পোস্ট করে জানিয়েছিলেন, এই ছবিগুলো বিভিন্ন বছর-২০১৮, ২০২১ ও ২০২৩-নায়াদিল্লির Oberoi হোটেলে নেওয়া হয়েছে এবং OSINT প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাওয়া গেছে। পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছিল, ছবিগুলোর মেটা ডাটা যাচাই করে সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, ভাইরাল হওয়া এই ছবিগুলো আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে তৈরি। দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, ছবিগুলোতে বাস্তবের কোনো বৈঠক দৃশ্য নেই এবং ছবির মেটা ডাটার উপর ভিত্তি করে “সত্যতা নিশ্চিত” করার দাবিটিও অসত্য।
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ৪টি ছবির মধ্যে দু’টি ছবিতে দেখা যায় আব্দুল আউয়াল মিন্টু ‘র’ কর্মকর্তার সঙ্গে হোটেলের লবিতে বৈঠক করছেন। অপর দু’টি ছবিতে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একই কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা গেছে।
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্যুট পরা আমীর খসরুর ছবি মূলত Oberoi হোটেলের Google Review-এ পাওয়া যায়। এখানে ছবিটি Ranjan Jha নামে একজন কাস্টমারের ৬ বছর আগের পোস্ট। মূল ছবির সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, ভাইরাল হওয়া ছবিতে দু’টি ব্যক্তির বসার দৃশ্য এআই-এর মাধ্যমে যোগ করা হয়েছে। ছবিতে কিছু মিল ও ত্রুটি থাকায় এটি স্পষ্ট যে, ছবিটি সম্পাদনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দ্য ডিসেন্ট ৪টি ছবি বিভিন্ন ওপেনসোর্স এআই ইমেজ ডিটেক্টর টুলে যাচাই করেছে। তিনটি ছবির ক্ষেত্রে টুলগুলো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তবে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে আরও একজন ব্যক্তির বসা ছবিটি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে এআই-জেনারেটেড হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এক ছবিতে ৮৫ শতাংশ, অন্যটিতে ১০০ শতাংশ এআই তৈরি বলে নির্ণয় করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, পোস্টের দাবি অনুযায়ী, আমীর খসরু ও মিন্টু তিনটি ভিন্ন বছরে কর্নেল গৌরব দোগরার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোতে দেখা যায়, ভিন্ন বছরে তোলা দু’টি ছবি প্রায় একই এঙ্গেল, একই ক্যামেরা এবং বৈঠকরত ব্যক্তিদের একই ভঙ্গি। বাস্তবের ঘটনা হলে এটি অসম্ভব। এটি এআই-জেনারেটেড ছবি চেনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
চতুর্থত, Shafin Rahman ফেসবুক পোস্টের কমেন্টে ছবিগুলোর উৎস হিসেবে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। ভিডিওটি মূলত Indus Sentinel Grid নামে একটি এক্স-হ্যান্ডেল থেকে নেওয়া। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই হ্যান্ডেলটি পাকিস্তান থেকে পরিচালিত এবং গত বছরের জুলাই মাসে তৈরি। সম্প্রতি প্রকাশিত পোস্টগুলো প্রায় সবই ভিত্তিহীন, সূত্রহীন এবং ভুয়া তথ্য বহন করে। বেশিরভাগ পোস্ট ভারত ও আফগানিস্তান সম্পর্কিত, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই দেশকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক বিষয় প্রচার করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, Indus Sentinel Grid ১৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি ভুয়া খবর অনুসারে অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি বিচে সন্ত্রাসী হামলার দায়ী একজনকে আফগান নাগরিক হিসেবে দেখিয়েছে, যদিও বাস্তবে তিনি ভারতীয় নাগরিক। এই ধরনের নিছক ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানোর প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পঞ্চমত, যেহেতু ভাইরাল ছবিগুলো এআই দ্বারা তৈরি, ফলে এগুলো যাচাই করার জন্য মেটা ডাটা চেকের দাবিটিও মিথ্যা। দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, ছবিগুলো আসল বৈঠক বা কোনও নির্দিষ্ট ঘটনাকে উপস্থাপন করে না, বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি।
এই ধরনের এআই-জেনারেটেড ছবি বা মিথ্যা তথ্য সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়। বিশেষত রাজনৈতিক চরিত্র এবং সংবেদনশীল বিষয়কে লক্ষ্য করে এ ধরনের ভুয়া ছবি তৈরি করা হয়। তথ্য যাচাই না করেই সামাজিক মাধ্যমে ছবি বা ভিডিও শেয়ার করলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে এবং ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান অনুসারে, ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোর বিশ্লেষণ থেকে নিম্নলিখিত মূল বিষয়গুলো পাওয়া যায়:
ছবিগুলোর মূল উৎস Ranjan Jha-এর Google Review, যেখানে আসল ছবির সাথে এআই-এর সাহায্যে পরিবর্তন করা হয়েছে।
৪টি ছবির মধ্যে অন্তত একটি ছবি স্পষ্টভাবে এআই-জেনারেটেড।
বিভিন্ন বছরের ছবিতে একাধিক চরিত্রের একই ভঙ্গি ও অবস্থান থাকা বাস্তবসম্মত নয়।
Shafin Rahman-এর পোস্টের উৎস Indus Sentinel Grid, যা পাকিস্তান থেকে পরিচালিত এবং প্রমাণহীন তথ্য প্রচার করে।
ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো মেটা ডাটা যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করার দাবিটিও ভিত্তিহীন।
সংক্ষেপে বলা যায়, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত এই ছবি বা ভিডিওগুলো বাস্তব ঘটনা নয়, বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি। বিশেষত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন ছবি ভাইরাল হলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। এ কারণে, অনলাইন ব্যবহারকারীদের এ ধরনের তথ্য যাচাই করার জন্য সতর্ক থাকা জরুরি।
ভিওডি বাংলা/জা







